May be art of 1 person

গল্প: নির্বিকার
মহিদুর রহমান

এই চার-পাঁচ মাসে দোকানপাঠে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। শহরের শপিংমলগুলো আগের মতোই সাজানো গুছানো। পশ্চিমবাজারের পাইকারী দোকানগুলোও ঠিক আগেরই মতো। দরজার সামনে মাথার উপরে বড় হরফে লেখা সাঁটানো সাইনবোর্ডগুলোও অপরিবর্তিত। সাথে দুএকটা কর্পোরেট বিজ্ঞাপন সেই আগের মতোই। ফুটপাথগুলো কেমন স্যাঁতস্যাঁতে কর্দমাক্ত। চিরায়ত চেহারাখানা এতোটুকু বদলায়নি। তবে রাস্তায়- ফুটপাথে মানুষের জটলা আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। আর যেটা বেড়েছে সেটা জিনিষপত্রের দাম! বলা যায়, দ্রব্যমূল্যের বাজারে বেশ কিছুদিন থেকে রীতিমতো সুনামি চলছে। সুনামির তাণ্ডবে ধূসর ফুটপাথের মতো বিবর্ণ হয়ে গেছে অনেকেরই মন। তবু ফুটপাথ ধরে যে এগিয়ে যাচ্ছে সে এক গৃহকর্তা। শিমুল ওরপে শিমুল দেবনাথ। ফুটপাথ ধরে তার মতো আরও অনেকেই যাচ্ছে আসছে।
শিমুল মোটামুটি পাঁচ ছয় মাস পরই শহরে এসেছে। অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে শিমুলের ইচ্ছে হয় হোটেলে বসে গরম পরোটা ভিজিয়ে এক কাপ চা খেতে। এ কোনো কঠিন ইচ্ছে নয়। এককাপ চা আর একটা পরোটাই তো? শহরের চৌমোহনা এলাকার এক অনাড়ম্বর হোটেলে বসেই চা-পরোটা অর্ডার করে শিমুল। খানিক বাদে অর্ডার মতো চা পরোটা টেবিলে আসতেই চোখ পড়ে পরোটার উপর। সাইজে ছোট আর নিউজপ্রিন্ট কাগজের মতো পাতলা। এই পাঁচ ছয়মাসে পরোটাখানার এমন করুণ পরিণতি হবে ভাবতে পারেনি শিমুল। চায়ের কাপেও একই দৃশ্য। যৎসামান্য চা পড়ে আছে একেবারে তলানিতে।
শিমুল মনে মনে ভাবে দাম ঠিক রাখতে গিয়ে হয়তো এমন কৃচ্ছ্রতা। কিন্তু পরে দাম চোকাতে গিয়ে দেখা গেল আট টাকার চা কাপ হয়ে গেছে পনেরো। আর পাঁচ টাকার পরোটা- সেও দশে গিয়ে থেমেছে। শিমুল ভেবে পায় না দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়েছে বলে চা পরোটার দাম বাড়ানো হয়েছে কিন্তু পরোটাকে কেন এমন পুষ্টিহীন ও ভগ্নসাস্থ্য করা হলো? চায়ের কাপের কেনই বা এমন হাড় কিপ্টে পরিণতি? দারিদ্র্যের হাতছানি? নাকি জিনিষপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে এমন কম্ম?
শিমুল বিষণ্ন মনে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়। আবারও ফুটপাথ ধরে হাঁটে। হঠাৎ সামনের একটা কনফেকশনারির দোকানে আনমনে চোখ আটকে যায়। তার খুব ইচ্ছে করে ভালো ব্র্যন্ডের এক প্যাকেট বিস্কুট কিনতে। তারপর বিস্কুট কিনতে গিয়ে দেখে ওখানেও একই কাণ্ড! পেকেটের দুই পাশে চারখানা করে বিস্কুট আর মাঝখানটা একদম ফাঁকা। শিমুল চর্মচক্ষে তাকিয়ে দেখে পেকেটের গায়ে যে দাম লেখা তা আগের চেয়ে দ্বিগুণ! আর সিঙাড়া চমোচা? এদের শরীর থেকেও খুবলে খুবলে কমানো হয়েছে মাংস। পেটের ভেতরে থাকা উপকরণও বেরসিক বাবুর্চি কর্তৃক করা হয়েছে সীমিত। জৌলুস হারিয়ে এরাও এখন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র!
শিমুল বিস্কুট না কিনেই দোকান থেকে বেরিয়ে যায়। সে ফুটপাথ ধরে নির্বিকার হাঁটতে থাকে। আকাশ দেখে। আর তার মন আনমনে দিগন্তে হারায়!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পরিচিতি: মহিদুর রহমান।